আওয়ামী লীগের কৌশল হচ্ছে কঠোর অবস্থান ধরে রেখে নির্বাচনের পথে হাঁটা

রাজনীতির মাঠ, আদালত ও সংসদ-এই তিন অঙ্গন ঘিরেই সেপ্টেম্বর হতে পারে ঘটনাবহুল মাস। সরকার ও সরকারি দল আওয়ামী লীগের কৌশল হচ্ছে কঠোর অবস্থান ধরে রেখে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পথে হাঁটা। আর বিরোধী দল বিএনপির লক্ষ্য জোট ভারী করে একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকারকে সমঝোতায় রাজি করানো। দুই পক্ষই ভোট সামনে রেখে এ মাস থেকেই মাঠ দখলে রাখা বা নেওয়ার লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, আগামী ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অক্টোবরে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন হতে পারে বলে সরকারি মহলে আলোচনা আছে। গতবারের মতো এবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার হবে, তবে মন্ত্রিসভার আকার ছোট হবে। তবে এতে বিএনপিসহ সংসদে প্রতিনিধিত্ব নেই এমন কোনো দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না বলে ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

এরই মধ্যে আগামী নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) চালু নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। ব্যালটের পাশাপাশি ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ রেখে নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে ইসি। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্র জানায়, ইভিএম নিয়ে তাদের বাড়তি কোনো উচ্ছ্বাস নেই। তবে বিএনপিকে ইভিএমের পেছনে ব্যস্ত রাখতে পারলে লাভ।

৯ সেপ্টেম্বর দশম জাতীয় সংসদের ২২ তম অধিবেশন বসছে। এটাই শেষ অধিবেশন হতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। সাধারণত শেষ অধিবেশন সংক্ষিপ্ত হয়। তবে এই অধিবেশন লম্বা না সংক্ষিপ্ত হবে, সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। অধিবেশন শুরুর আগ দিয়ে সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি বৈঠক করে অধিবেশনের মেয়াদ নির্ধারণ করে থাকে।

বিএনপির সূত্র বলছে, যেকোনো মূল্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে দলটির মধ্যে জোরালো অবস্থান আছে। তারা সরকারবিরোধী অন্য রাজনৈতিক দল নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি ও খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।

তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র বলছে, বিএনপি মাঠে নামার চেষ্টা করলে ধরপাকড় শুরু করার পরিকল্পনা আছে। একই সঙ্গে বিএনপিতে বিভক্তি আসে কি না, সেদিকেও সরকারি দলের দৃষ্টি আছে। সরকারবিরোধীরা যাতে ঐক্যবদ্ধ না হতে পারে, সেই চেষ্টাও আছে আওয়ামী লীগের।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন দলের জোট গঠনের তৎপরতা, সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ-সব মিলিয়ে সবাই নির্বাচনের মুডে (মেজাজ) চলে গেছে। সেপ্টেম্বরে তা আরও বাড়বে। সংসদে প্রতিনিধিত্ব আছে এমন রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের যে রূপরেখা ২০১৩ সালে চালু হয়েছে, এবারও তা-ই করা হবে। অক্টোবরেই এই সরকার হতে পারে।

সরকার ও আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের সূত্র বলছে, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণহীন ও দুর্বল বিএনপিকে ভোটে আনতে চায় সরকার। সরকারি দলের একটি অংশ ভাবছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা না পেয়ে বিএনপি এবারও নির্বাচন বর্জন করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বিএনপির একটা অংশকে নির্বাচনে আনা সহজ হবে। তবে ‘দুর্বল বিএনপি’ ভোটে এলে সংলাপের একটা সম্ভাবনা থাকবে।

তবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া ও বর্তমান সংসদ কার্যকর রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না। সরকারের দায়িত্ব এই অচলাবস্থা নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া, সংলাপ শুরু করা।

জোট-মহাজোটের নানা হিসাব
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল প্রায় এক যুগ পার করেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ভিত্তিও অনেক দিন আগের। এখন সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জোট-মহাজোট গঠনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার রাতে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বাসায় বৈঠক করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ যুক্তফ্রন্টের নেতারা। তাঁরা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বৃহত্তর ঐক্য গঠনে কাজ করতে একমত হয়েছেন। যুক্তফ্রন্টে রয়েছে বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও নাগরিক ঐক্য। এর বাইরে গত ১৮ জুলাই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিবি) আটটি বাম দলের সমন্বয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই দুই জোট ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারি বা বিরোধী যেকোনো জোটে যাবে, নাকি আলাদা তৃতীয় কোনো জোট করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। অবশ্য সরকারি দল আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে কামাল হোসেন ও বি. চৌধুরীকে নানাভাবে বিতর্কিত করার কৌশল নিয়েছে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়ে কাজ চলছে। প্রতিটি দল-জোট নিজেদের হিসাব-নিকাশ করছে। একটা অভিন্ন ইস্যু ধরে এগোনোর চেষ্টা চলছে।

গত বছর মে মাসে দুটি দল ও দুটি রাজনৈতিক জোটের সমন্বয়ে সম্মিলিত জাতীয় জোট (ইউএনএ) নামের একটি ‘বৃহত্তর জোট’ গঠনের ঘোষণা দেন জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। অধিকাংশ অখ্যাত দল নিয়ে গড়া এই জোটের কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। গত ১৮ জুলাই বিএনপির সাবেক মন্ত্রী নাজমুল হুদার বিএনএসহ অপরিচিত ৯টি দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের সঙ্গে মতবিনিময় করে সরকারের শরিক হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

জাতীয় পার্টি-জামায়াতের ভূমিকা কী হবে
জোট-মহাজোট যা-ই হোক না কেন, ভোটের মাঠে এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে আওয়ামী লীগ। এ জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ যেকোনো নির্বাচনে জাপাকে পাশে চায় দলটি। ইতিমধ্যে এরশাদ আওয়ামী লীগকে এ বিষয়ে নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, এরশাদ যা-ই বলুন না কেন, তাঁর অবস্থান ঠিক হবে পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে।

বিএনপি ভোটের মাঠে জামায়াতকে শক্তি মনে করে। কিন্তু দলটির সঙ্গে গাঁটছড়া বিএনপিকে সমালোচনায় ফেলছে। বিএনপির একটি অংশ জামায়াতকে ত্যাগ করার পক্ষে। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে দূরত্বও বেড়েছে। বিএনপির অনুরোধ উপেক্ষা করে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী দেয় জামায়াত। যদিও জামানত হারিয়েছে দলটির প্রার্থী। জামায়াতের নিবন্ধন নেই। তারপরও দলটিও ভেতরে-ভেতরে বিভিন্ন আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, গত নির্বাচনের আগে যে পরিবেশ ছিল, এর পরিবর্তন এখনো দেখা যাচ্ছে না। এরপরও তাঁর বিশ্বাস, নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, দলগুলোর মধ্যে দায়বদ্ধতার বোধ তৈরি হবে। তখন জনগণের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাঁরা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন। এর আগে জনগণকে ভূমিকা পালন করার পরিবেশটা রাজনীতিবিদদেরই তৈরি করে দিতে হবে। এর জন্য যতটা আন্তরিক ও সহযোগিতার মনোভাব দেখানো দরকার, তা রাজনীতিকেরা করবেন বলে তিনি মনে করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *