দবিরুলের পরিবারের গ্রাসে সবকিছু

  • ঠাকুরগাঁও-২ আসনের ছয়বারের সাংসদ দবিরুল ইসলাম।
  • অভিযোগের পাহাড় তাঁর বিরুদ্ধে।
  • তবে সাংসদ সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে টিফিন বক্স বিতরণ অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি সাংসদ দবিরুল ইসলাম। দুই বিশেষ অতিথির একজন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, অন্যজন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। সভার সভাপতি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান। এঁরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। শুধু এ অনুষ্ঠান নয়, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার সবকিছুর নিয়ন্ত্রক সাংসদ দবিরুল ইসলামের পরিবার। দলীয় পদ, সরকারি সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তি, নিয়োগ–বাণিজ্য, প্রকল্পের কাজ, চাঁদাবাজি—সবকিছুর নিয়ন্ত্রক এক পরিবার।

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা সাংসদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ তুললেও নাম প্রকাশের ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে ভীতি আছে। তাঁরা বললেন, দবিরুলের পারিবারিক দাপটের কারণে মাঠ থেকে উঠে আসা নেতাদের অনেকে এখন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের এক নেতা বললেন, ‘বালিয়াডাঙ্গীতে আওয়ামী লীগ নেই, আছে দবিরুল লীগ।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও আওয়ামী লীগের টিকিটে ছয়বারে ২৭ বছর ধরে ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সাংসদ দবিরুল ইসলাম। বালিয়াডাঙ্গী, রানীশংকৈল আংশিক ও হরিপুর উপজেলা নিয়ে তাঁর সংসদীয় আসন। কিন্তু তাঁর উপজেলায় আওয়ামী লীগের কোনো কার্যালয় নেই। দলের বৈঠক হয় তাঁর বাড়িতে। এখন তিনি জেলা আওয়ামী লীগেরও সভাপতি। কিন্তু দলের নেতা–কর্মীদের অভিযোগ, তিনি কেবল বালিয়াডাঙ্গী নিয়েই পড়ে আছেন।

তবে সাংসদ দবিরুল ইসলাম সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, তাঁর পরিবারের সদস্যরা সবাই নিজেদের যোগ্যতায় যাঁর যাঁর অবস্থানে এসেছেন। বাকি ‘গালগল্প’ (অভিযোগ) ছড়ানো হচ্ছে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে না পেরেই।

তবে মুখে বাগাড়ম্বর করলেও নানা অভিযোগের কারণে ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছেন সাংসদ। আসনটি নিজের আয়ত্তে রাখতে ছেলে মাজহারুল ইসলামকে মাঠে নামিয়েছেন তিনি। মাজহারুল বাবার পক্ষে সরকারি ভবন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ–সংযোগ পর্যন্ত সবকিছুর তদারক, ভিত্তিপ্রস্তর ও উদ্বোধনে অংশ নিচ্ছেন।

পরিবারতন্ত্র
সাংসদ দবিরুল ইসলাম ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তাঁর মেজ ভাই মোহাম্মদ আলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। মোহাম্মদ আলী বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন। সাংসদের আরেক ভাই সফিকুল ইসলাম উপজেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান। সাংসদের বড় ছেলে মাজহারুল ইসলাম জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। ভাতিজা (মোহাম্মদ আলীর বড় ছেলে) আকরাম আলী বালিয়াডাঙ্গীর বড়বাড়ি ইউপির চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। মোহাম্মদ আলীর আরেক ছেলে আলী আসলাম উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক। সাংসদের ছোট ছেলে মোমিনুল ইসলাম উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। আর ভাগনে–বউ সুমি আক্তার উপজেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক।

অভিযোগ নিয়োগ–বাণিজ্যের
চাকরি পাইয়ে দিতে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাংসদের বিরুদ্ধে। টাকা দিয়েও চাকরি পাননি বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন। কারও কারও টাকা ফেরতও দিয়েছেন সাংসদ।
পুলিশের কনস্টেবল পদে ছেলের চাকরির জন্য হরিপুর উপজেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইসাহাক আলী সাংসদকে ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা দেন। চাকরি হয়নি। পরে সাংসদ টাকা ফেরত দেন। ইসাহাক আলী বলেন, ‘আমি দলীয় লোক, এমপি তবুও আমার সঙ্গে গাদ্দারি করল। আপনি এলাকায় ঘুরে দেখেন এমপির বিরুদ্ধে এমন অনেক অভিযোগ পাবেন।’
হরিপুর উপজেলার মশানগাঁও গ্রামের মো. সুলতান সরকার মশানগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী কাম পিয়ন পদে তাঁর ভাতিজা তরিকুল ইসলামের চাকরির জন্য ৫ লাখ টাকা সাংসদকে দেন। সুলতান বলেন, ‘ভাতিজার চাকরির জন্য দুই বিঘা জমি বিক্রি করেছিলাম। কিন্তু বেশি টাকা পেয়ে ওই পদে জাহাঙ্গীর আলম নামে ওয়ার্ড বিএনপির এক নেতাকে চাকরি দিলেন সাংসদ।’
হরিপুর উপজেলার কাদিয়ারা গ্রামের মকবুল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, হরিপুর উপজেলার ১৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী কাম পিয়ন পদে চাকরির জন্য কমপক্ষে ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সাংসদ। তিনি (মকবুল হোসেন) নিজেও তাঁর ছেলের চাকরির জন্য সাংসদ দবিরুলকে ৭ লাখ টাকা দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
হরিপুর উপজেলার আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, ‘এমপি একটি পদে চাকরি দিতে অনেক প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নেন। যে সবচেয়ে বেশি টাকা দেয়, সে বিএনপি হোক, জামায়াত হোক আর জঙ্গি হোক—তাকে চাকরি পাইয়ে দেন।’

নাশকতা মামলায় অভিযুক্তদের জন্য সুপারিশ
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার একটি ভোটকেন্দ্রে সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা হত্যাসহ ভোটকেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলাসহ ঠাকুরগাঁও, বালিয়াডাঙ্গী ও সিরাজগঞ্জ বাজার জিআরপি থানায় করা ১৭টি মামলা থেকে ১৫ জন আসামির নাম ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বিবেচনায়’ প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন সাংসদ দবিরুল।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলা থেকে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা (পশ্চিম) জামায়াতের আমির মো. শামসুজ্জামানের নাম বাদ দেওয়ারও সুপারিশ করেন তিনি। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন সাংসদ।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি নাশকতার মামলার আসামি বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলামের পক্ষে ‘অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপে জড়িত নয় ও তিনি ভালো লোক’ এমন একটি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন সাংসদ দবিরুল। ওই প্রত্যয়নপত্রটি সংযুক্ত করে ২২ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলা দায়রা ও জজ আদালতে রফিকুলের জামিন আবেদন করেন তাঁর আইনজীবী। রফিকুল হরিপুর উপজেলার আমগাঁও ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলে জানিয়েছেন ওই ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি আবু তাহের।
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আলম বলেন, যারা ভোটকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে নির্বাচনী কর্মকর্তাকে হত্যা করে, নাশকতা করে; মামলা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করে সাংসদ দলের সঙ্গে বেইমানি করেছেন।

সংখ্যালঘুদের জমি দখলের চেষ্টা
সাংসদ দবিরুল ইসলাম ও তাঁর ছেলে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম ওরফে সুজনের বিরুদ্ধে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার রণবাগ এলাকার সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি দখলে নিতে তাদের ভয়ভীতি দেখানো ও হামলার অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে ২০১৬ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠায় একটি গোয়েন্দা সংস্থা। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাংসদ দবিরুল ইসলাম বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পাড়িয়া ইউনিয়নের রণবাগ নামক স্থানে রণবাগ ইসলাম টি এস্টেট কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি চা-বাগান গড়ে তুলেছেন। ১০৬ একর আয়তনের ওই বাগানের মাঝখানে কয়েকজন সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের চা-বাগান ও আবাদি জমি রয়েছে। এসব জমি নিজেদের দখলে নিতে সাংসদ ও তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু পরিবারের লোকজনকে ভয়ভীতি দেখানো ও হামলার অভিযোগ উঠেছে।
ভূক্তভোগীদের একজন অকুল চন্দ্র সিং বলেন, ‘চা-বাগানের জমি এমপির ছেলে সুজন তাঁর নামে লিখে দেওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এতে কাজ না হওয়ায় আমাদের ওপর হামলাও করেছিলেন। আমরা এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন পাশে দাঁড়ানোয় আমরা এখনো টিকে আছি।’

বাদ যায়নি কৃষি–ভর্তুকির যন্ত্রপাতিও
কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের নানা প্রকার যন্ত্রপাতি কিনতে উন্নয়ন সহায়তা (ভর্তুকি) দেয় সরকার। এ সহায়তাও হাতিয়ে নিয়েছেন সাংসদ দবিরুলের পরিবারের সদস্যরা। ২০১৫ সালের নথিপত্রে দেখা যায়, সরকারি সহায়তার কলের লাঙল (পাওয়ার টিলার) বরাদ্দ পেয়েছেন সাংসদ দবিরুলের পরিবারের পাঁচ সদস্য। তাঁরা হলেন সাংসদের মেজ ভাই মোহাম্মদ আলী, তাঁর দুই ছেলে আকরাম আলী ও আলী আসলাম, ছোট ভাই সফিকুল ইসলাম এবং সাংসদের ছেলে মোমিনুল ইসলাম।
জানতে চাইলে সাংসদের ছোট ভাই সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এমপির ছোট ভাই ও উপজেলা চেয়ারম্যান হলেও আমি কৃষক। তাই চাষের প্রয়োজনে ভর্তুকির পাওয়ার টিলার নিয়েছি।’

মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিতে স্বজনেরা
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে নজরুল ইসলাম ওরফে নয়ন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তিনি বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ীহাট এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর সঙ্গে আছেন মাহে আলম ওরফে স্বপন ও আলমগীর কবীর ওরফে লিপটন। এঁরা সবাই সাংসদ দবিরুলের ভাগনে। ১৭ সেপ্টেম্বর এক রায়ে আদালত লিপটনকে পাঁচ বছর এবং নয়ন ও স্বপনকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেন।
এই তিনজন লাহিড়ী সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে দীর্ঘদিন চাঁদা আদায় করে আসছেন। চাঁদা না পেয়ে গত ৩০ জানুয়ারি লিপটনের নেতৃত্বে কয়েকজন যুবক অফিসের নথিপত্র ছিঁড়ে ফেলেন এবং কর্মচারীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। ওই ঘটনায় মামলাও হয়।

সাংসদের বক্তব্য
সব অভিযোগ এককথায় নাকচ করে দেন সাংসদ দবিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বালিয়াডাঙ্গীতে আওয়ামী লীগ ছাড়া এখন কোনো দলের অবস্থান নেই। নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আমি শক্ত হাতে মাঠে থেকে বিএনপি-জামায়াতের নাশকতা দমন করেছি। আমাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার মতো শক্তি এলাকায় কারও নেই। জনগণের ভালোবাসা আছে বলেই আমি ছয়-ছয়বার এমপি নির্বাচিত হয়েছি। রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজসহ নানা অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন করে এলাকাকে গুছিয়ে ফেলেছি। এখন একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে লেগেছে। তারা আমার বিরুদ্ধে নানা রকম গালগল্প ছড়াচ্ছে। দলের তৃণমূল নেতা-কর্মী ও এলাকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এসব অপপ্রচার মোকাবিলায় আমি নিজেই যথেষ্ট।’