প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে মাদকাসক্ত ক্রু ফারাহাত জামিলকে প্রত্যাহার

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী উড়োজাহাজের নাট ঢিলা থাকা ও এক কেবিন ক্রুকে মাদকাসক্ত অবস্থায় ভিভিআইপি ফ্লাইট থেকে অফলোডের ঘটনায় সম্পৃক্ত ফ্লাইট অপারেশন পরিচালক ও পাইলট ফারাহাত জামিলকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে কেবিন ক্রু ফ্লাইট অপারেশন শাখার ডিজিএমকেও গ্রাউন্ডেন্ড করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীকে লন্ডন থেকে ফিরিয়ে আনতে যাওয়া ফ্লাইটের ককপিটে বসার পর শনিবার সকালে ক্যাপ্টেন ফারাহাত জামিলকে ফ্লাইট থেকে নামিয়ে আনা হয়। বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে, তাকে নিরাপত্তাজনিত কারণে অফলোড করা হয়েছে। তার পরিবর্তে ওই ফ্লাইট অপারেট করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আরেক পাইলট ক্যাপ্টেন গোলাম মোহাম্মদ খাজাকে। এ ঘটনায় লন্ডন ফ্লাইট দেড় ঘণ্টা বিলম্ব হয়।

জানতে চাইলে বিমানের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (প্রশাসন) পার্থ কুমার চাংকি পান্ডে বলেন, আমি এখনও কিছুই জানি না। এটা পরিচালক গ্রাহক সেবার কাজ। তাকে জিজ্ঞেস করুন। বিমান সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী লন্ডনগামী ফ্লাইট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়ার আগ মুহূর্তে ডোপ টেস্টে মাদক গ্রহণের প্রমাণ পাওয়ায় কেবিন ক্রু মাসুদা মুফতিকে অফলোড করা হয়।

ওই ঘটনায় পরবর্তী পদক্ষেপ না নিয়ে ক্যাপ্টেন ফারাহাত জামিল একই ফ্লাইটের পাইলট ইন চিফ হিসেবে লন্ডন যান। তিনি ওই ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন। একই ফ্লাইটে ডিউটি করতে লন্ডন যান একই শাখার ডিজিএম নুরুজ্জামান রঞ্জু। এ ঘটনা মিডিয়ায় ফাঁস হওয়ার পর তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমান মাসুদা মুফতিকে গ্রাউন্ডেড আর নুরুজ্জামান রঞ্জুকে ডিজিএমের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। কিন্তু এ ঘটনায় রহস্যজনক নীরব থাকা ও দায়িত্বহীনতার পরও ফারাহাত জামিলের বিরুদ্ধে বিমান কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

এতে বিস্ময় প্রকাশ করেন শাহজালালে দায়িত্বরত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। উল্টো প্রধানমন্ত্রীকে লন্ডন থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আবারও প্রধান পাইলট হিসেবে দায়িত্ব দেয় ক্যাপ্টেন ফারহাত জামিলকে। শনিবার সকাল ১০টায় যথারীতি তিনি ককপিটে পৌঁছেও যান।

তখন একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে বিমানকে জানানো হয়, তার সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স নেই। তাকে দিয়ে এ ফ্লাইট অপারেট না করার জন্যও জানানো হয়। এরপর গোয়েন্দা সংস্থার আপত্তির মুখে ফারাহাত জামিলকে ফ্লাইট থেকে নামিয়ে এনে স্থলাষিভিক্ত করা হয় স্ট্যান্ডবাই পাইলট ক্যাপ্টেন খাজাকে। দেড় ঘণ্টা বিলম্বে তিনি কো-পাইলট ক্যাপ্টেন হাসনাইনকে নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন।

এর আগে ২০১৪ সালের ১ অক্টোবর পাইলট ফারাহাত জামিল প্রধানমন্ত্রীকে আনার জন্য লন্ডন থেকে পজিশনিং নেয়ার পর তাকে অফলোড করা হয়। পরে জরুরিভিত্তিতে ঢাকা থেকে ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলামকে মালয়েশিয়া হয়ে লন্ডন পাঠিয়ে ওই ফ্লাইট দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে নাট ঢিলা থাকার ঘটনায় প্রধান পাইলট ছিলেন ক্যাপেন্ট ফারাহাত জামিল। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বারবার এত বিতর্কের পরও কেন তাকে ভিভিআইপি ফ্লাইটের দায়িত্ব দেয়া হয়, সেটা রহস্যজনক।

খোদ বিমানের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ফ্লাইট অপারেশন রেকর্ড অনুযায়ী, বর্তমানে বিমানের ফ্লাইট অপারেশন বিভাগ ও পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) অধিকাংশ নেতা সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

কিন্তু এদের সিদ্ধান্তের বাইরে বিমান ম্যানেজমেন্ট কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে কারা যাবেন, কারা স্ট্যান্ডবাই থাকবেন সেটা নির্ধারণ করে দেয় বাপা। অথচ এটি করার কথা বিমান ম্যানেজমেন্ট ও ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের।

ক্যাপ্টেন ফারাহাত জামিল ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের পরিচালক হওয়ার পর বাপার নেতারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তারা একের পর এক ভিভিআইপি ফ্লাইটে বিতর্কিত ও বারবার ফেল করা পাইলটদের দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছেন।

এমনকি শনিবারের ফ্লাইটেও সিমুলেটরে একাধিকবার ফেল করা একজন পাইলট ও বাপার একজন শীর্ষ নেতাকে স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়। গত ১০ বছর ধরে বাপার ওই নেতা প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স পাচ্ছিলেন না। কিন্তু হঠাৎ করে ওই ফ্লাইটে তাকে স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমান জনসংযোগ কর্মকর্তা (জেনারেল ম্যানেজার) শাকিল মেরাজ যুগান্তরকে বলেন, আমি যতটুকু জেনেছি ফ্লাইটটি বিলম্বে ছেড়ে গেছে। ক্যাপ্টেন খাজা ফ্লাইটটি পরিচালনা করেছেন। পরিচালক ফ্লাইট অপারেশনকে অফলোড করার তথ্য আমি জানি না।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের দায়িত্ব নিয়ে বারবার অবহেলা ও গাফিলতির ঘটনা ঘটছে। একের পর এক অঘটন ঘটলেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না দায়ীদের বিরুদ্ধে। আমলে নেয়া হচ্ছে না গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশনাও।

গত ২১ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইট টেকঅফের তিন ঘণ্টা আগে পরিচালক ফ্লাইট অপারেশন ক্যাপ্টেন ফারাহাত জামিলের উপস্থিতিতে কেবিন ক্রুদের ডেকে নিয়ে হঠাৎ ডোপ টেস্ট শুরু করেন বিমানের নিজস্ব চিফ অব মেডিকেল (সিএমও) ডাক্তার তসলিমা।

১৮ জনের মধ্যে একমাত্র মাসুদা মুফতির শরীরে মাদকের প্রমাণ মেলে। এরপর ১৭ জন ক্রু নিয়েই প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইট অপারেট হয়, যার পাইলট ইন চিফ ছিলেন ফারাহাত জামিল। মাসুদা মুফতি ফারাহাত জামিলের অধীনে স্টাফ হওয়ার পর তিনি মাদকের ঘটনা ককপিটের লগবুকে উল্লেখ করেননি। কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া বা কারণ দর্শানোও হয়নি।

ঘটনা তদন্তকারী এক গোয়েন্দা সদস্য বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এর আগে কখনোই ভিভিআইপি ফ্লাইটের আগে ডোপ টেস্ট করা হয়নি। যদি করা হতো তাহলে কেউ মদ পান করে ফ্লাইটে ওঠার সাহস পেত না।

তিনি বলেন, ডোপ টেস্টের সময় স্ট্যান্ডবাই ক্রু না রাখায় একজন ক্রু কম নিয়েই ফ্লাইট ছাড়তে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইট নিয়ে অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার ঘটনা আরও ঘটেছে। সম্প্রতি ড্রিমলাইনার উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিমানে লন্ডন যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।

তার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ভিভিআইপি ফ্লাইটের কো-অর্ডিনেশন মিটিংয়ে জানতে চাইলে বিমান থেকে বলা হয়, বোয়িং ৭৭৭-এর যাত্রী পূর্ণ হয়ে গেছে। এর পরিবর্তে ড্রিমলাইনার দেয়া হলে কিছু যাত্রীকে অফলোড করতে হবে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এটা ছিল পুরোপুরি মিথ্যা। প্রকৃত তথ্য হল- বিমান তখনও ড্রিমলাইনের ডকুমেন্টেশন তৈরি, ক্রু প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কাজ শেষ করতে পারেনি।

এ বিষয়ে বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, ড্রিমলাইনার আসবে সেটা নির্ধারণ করা ছিল তিন বছর আগে। কিন্তু এতদিনেও বিমান ড্রিমলাইনটি দিয়ে লন্ডন ফ্লাইটের প্রস্তুতি নিতে পারেনি। যার কারণে বাধ্য হয়ে ড্রিমলাইনার দিয়ে বিমানকে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া ফ্লাইট পরিচালনা করতে হচ্ছে।

এ ছাড়া কিছু দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে এসএসএফের অনুমোদনবিহীন একটি ফ্লাস্ক উঠানোর ঘটনায় তোলপাড় হয়। প্রধানমন্ত্রীর অপর একটি ফ্লাইটে ব্যবহারিক জিনিসপত্রের মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

তখন একটি গোয়েন্দা সংস্থা বিমানের জন্য মানসম্মত কম্বল, টিস্যু, কুশন, কার্পেট, পর্দা ও অন্যান্য জিনিস নিশ্চিত করে তা এসওপি-ভুক্তির নির্দেশ দেয়। বিমান থেকে এ সংক্রান্ত্র একটি ফাইলও অনুমোদনের জন্য দেয়া হয়। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট তা প্রত্যাখ্যান করে উল্টো ফাইল পাঠানোর অপরাধে এক জিএমকে সরিয়ে দেয়।