রেজার ছবির রাজ্য

স্থাপত্যের পড়ালেখার চাপে যখন ত্রাহি ত্রাহি দশা, তখন সময় বের করে নিয়মিত ছবি তোলা এনামুর রেজার জন্য রীতিমতো ‘সংগ্রাম’! এরই মধ্যে তাঁর তোলা বেশ কিছু ছবি দেশ-বিদেশের নামী সাময়িকীগুলোতে ছাপা হয়েছে। অতএব আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে তৃতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীকে স্রেফ শখের আলোকচিত্রী বললে ভুল হবে। কিছুদিন আগে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। ‘বিকেল হলেই ঢাকার অলিগলিতে বেরিয়ে পড়ি। কখনো মিরপুরে, কখনো আবার পুরান ঢাকায়। নতুন কোনো জায়গা থেকে ঘুরে আসার চেষ্টা করি ছুটির দিনগুলোতে। নতুন কিছু দেখার, ক্যামেরায় ধরার প্রবল ইচ্ছা আছে বলেই দমে যাই না।’ বলছিলেন এনামুর।

বড় হয়েছেন পাবনা জেলায়। ছবি তোলার শুরু সেখানেই। ‘মফস্বল শহর হওয়ায় একটা বাড়তি সুবিধা ছিল। সামান্য দূরত্ব হাঁটলেই সুন্দর সুন্দর জায়গায় চলে যাওয়া যেত। সেসব জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে ছবি তোলার শুরু। প্রথম দিকে আমি এক বন্ধুর ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতাম। সে আবার ক্যামেরা খুব একটা ব্যবহার করত না। এই সুযোগটা কাজে লাগিয়েছিলাম আমি। আমার ঘোরাফেরার সঙ্গী হয়ে গিয়েছিল বন্ধুর ক্যামেরা।’ জানালেন তিনি।

অন্যের ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা শুরু নাহয় হলো। কিন্তু নিজের একটা ক্যামেরা না হলে তো আর চলে না। সেটার বন্দোবস্ত কী করে হলো? এনামুর রেজা বলেন, ‘প্রথমে বাসায় ক্যামেরা কেনার জন্য আবদার করেছিলাম। কিন্তু পরিবারের সামর্থ্যের কথা চিন্তা করে খুব একটা জোরগলায় বলতে পারিনি। তখন ভেবেছি, ক্যামেরা পরে কেনা যাবে। তার আগে নাহয় ছবি তোলার হাতটা আরও একটু পাকা হোক।’ এ রকম একটা সময়েই পদ্মার চর নিয়ে কাজ করার একটা সুযোগ পান তিনি। কখনো মোবাইল ফোনে, কখনো বা বন্ধুর ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে থাকেন। ‘২০১৩ সালের শুরুতে “ফটোগ্রাফি বাংলাদেশ” গ্রুপের আয়োজনে “ফ্রেমিং দ্য হান্ড্রেড” প্রদর্শনীতে আমার প্রথম ছবি নির্বাচিত হয়। সেই থেকে শুরু। তার দুই বছর পর মা ঋণ নিয়ে আমাকে একটা ক্যামেরা কিনে দেন।’

ভালো ছবি তুলতে হলে নিজস্ব একটা দেখার চোখ, একটা দর্শন থাকতে হয়। এনামুর রেজা কথা বলছিলেন এ প্রসঙ্গে। ‘আমি ফ্লিকারে প্রচুর ছবি দেখতাম। সেখান থেকে নিজস্ব একটা দর্শন তৈরি হতে থাকে। প্রথম দিকে যা ইচ্ছা হতো, তুলতাম। ইচ্ছা ছিল মানুষকে আমার চারপাশটা এমনভাবে দেখাব, যেভাবে আগে কেউ দেখেনি। এ কারণে শুরু থেকেই পয়েন্ট অব ভিউ, কম্পোজিশন, ফ্রেমিং ইত্যাদি সবকিছুই অন্যদের চেয়ে আলাদা করার একটা আগ্রহ ছিল।’

বিখ্যাত সাময়িকী, ওয়েবসাইটগুলো ছাড়াও সময় পেলেই দেখেন বড় বড় আলোকচিত্রীর কাজ। তাঁরা কী ছবি তুলছেন, কীভাবে তুলছেন, সেগুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করেন। ‘স্টিভ ম্যাককারিকে অনুসরণ করার চেষ্টা করতাম আমি। এ ছাড়া হেনরি কার্টিয়ার ব্রেসনের কাজও আমার খুব ভালো লাগে। আর রং নিয়ে বিশেষ করে অ্যালেক্স ওয়েবের কথা বলতেই হয়। তাঁরা আমার কাছে আদর্শ।’

নিজে ছবি তোলার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটোগ্রাফি ক্লাবেও সক্রিয় তিনি। বর্তমানে রয়েছেন ‘এইউএসটি ফটোগ্রাফি ক্লাব’-এর জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্বে। জানা গেল, প্রতি সেমিস্টারে একটি অন্তবিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন তাঁরা। এনামুল বলেন, ‘এ ছাড়া আমরা প্রতিবছর “ড্রিম বিয়ন্ড ইমাজিনেশন” নামে একটি আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী আয়োজন করে থাকি। দেশ-বিদেশের নানান ফটোগ্রাফারের ছবি থাকে সেখানে। এ ছাড়া প্রতি সেমিস্টারে ক্লাবে নতুন সদস্য যোগ হলে তাদের নিয়ে আমরা “ফটোওয়াক”-এর আয়োজন করি।’

বর্তমানে একটি আলোকচিত্র প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত আছেন এনামুর রেজা। প্রতিষ্ঠানের আওতায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি তোলেন তাঁরা। কিন্তু এনামুর রেজার পছন্দের ক্ষেত্র হলো ‘স্ট্রিট’। অর্থাৎ পথঘাট, সাধারণ মানুষের ছবিই তাঁকে বেশি টানে। ইতিমধ্যে অর্জনের খাতাটাও খুলতে শুরু করেছে। ‘আমার অর্জন বলতে গেলে এখন পর্যন্ত ৩০টির বেশি প্রদর্শনীতে আমার ছবি ছিল। কয়েকটি আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনে আমার তোলা ছবি ছাপা হয়েছে। যেমন এপিএফ, ওয়ান টু ওয়ান ক্লিক্স ইত্যাদি।’

ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একটু ভাবনায় পড়ে গেলেন। বললেন, ‘স্থাপত্য তো শিল্পেরই একটা শাখা। আর আলোকচিত্রের সঙ্গে এর একটা আত্মিক সম্পর্ক আছে। আর্কিটেকচারে থেকে ভিজ্যুয়াল তৈরি করার ব্যাপারটা শিখেছি, শিখছি। ভবিষ্যতে এটা ফটোগ্রাফিতে প্রয়োগ করতে চাই। আমার ইচ্ছা ফটোগ্রাফি আর আর্কিটেকচার মিলিয়ে কিছু ভিজ্যুয়াল আর্ট তৈরি করে যাওয়া। যেখানে আর্কিটেকচারের পাশাপাশি থাকবে ফটোগ্রাফি।’ অর্থাৎ ভালো লাগা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার—তিনটিকে সমান্তরালে রাখতে চান এই তরুণ।