আসছে নির্বাচনী প্রচার সহায়ক উন্নয়ন প্রকল্প

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ৩৪টি জেলার ১৮০টি উপজেলায় গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এটিসহ ১৫টি উন্নয়ন প্রকল্প উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এ ছাড়া একনেকের অবগতির জন্য ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও পাঁচটি প্রকল্প তুলে ধরা হবে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচনী প্রচারে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রকল্প এলাকার জনপ্রতিনিধিরাও বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন।

গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে ‘রুরাল কানেকটিভিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (আরসিআইপি)’ নামে নতুন প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ। এটি বাস্তবায়নে তিন হাজার ৬৬৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এক হাজার ১৭২ কোটি ১৩ লাখ টাকা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ থেকে দুই হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরি রোববার যুগান্তরকে বলেন, এখন গ্রামীণ অবকাঠামো সংক্রান্ত যেসব প্রকল্প অনুমোদন পাচ্ছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন শুরু হতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা সময় লাগবে। তবে অনুমোদন পেলে যেসব এলাকায় বাস্তবায়িত হবে সেখানকার জনপ্রতিনিধিরা বলতে পারবেন- এই রাস্তা বা এই ব্রিজের উন্নয়ন হবে। সেই ধারণা থেকে বলা যায়, এসব প্রকল্প নির্বাচনী প্রচারে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রকল্প এলাকার জনপ্রতিনিধিরা বাড়তি অ্যাডভান্টেজ পেতে পারেন।

সূত্র জানায়, রুরাল কানেকটিভিটি ইমপ্র্রুভমেন্ট প্রকল্পের আওতায় দুই হাজার ২১০ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক, ৪৯৫ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক উন্নয়ন এবং ২৫০ কিলোমিটার সড়কে বৃক্ষরোপণ করা হবে। এ ছাড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ১৯১টি জিপ, পিকআপ ও মোটরসাইকেল ক্রয় এবং সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। একনেকে অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে প্রকল্পটির কাজ শুরু হবে এবং ২০২৩ সালের জুনে শেষ হবে। প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) বাস্তবায়ন করবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর, নড়াইল, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, রাজশাহী, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রকল্পের প্রস্তাবনায় বলা হয়- উপকূলীয় ১৩ জেলায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামীণ সড়কসমূহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এলজিইডির রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমকে সহায়তার উদ্দেশ্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে একটি কর্মসূচি গৃহীত হয়। কর্মসূচির প্রস্তুতির জন্য ২০১৬ সালে এডিবি ২০ লাখ মার্কিন ডলার প্রজেক্ট ডিজাইন অ্যাডভান্সড (পিডিএ) ঋণ দেয়। পরবর্তী সময়ে মূল ১৩টি জেলার সঙ্গে এডিবির সহায়তায় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সমাপ্ত হওয়া সাসটেইনেবল রুরাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (এসআরআইআইপি) প্রকল্পের ২১টি জেলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া ২০১৭ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্বাসনে এডিবির দেয়া ১০ কোটি ডলার যুক্ত করে রুরাল কানেকটিভিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট শিরোনামে প্রকল্পের নতুন নামকরণ করা হয়। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য সুবীর কিশোর চৌধুরী একনেকের জন্য তৈরি সারসংক্ষেপে কমিশনের মতামত দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ২০১৭ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও এডিবির অর্থায়নে প্রকল্পটির প্রস্তাব করা হয়। পল্লী অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় একনেকে অনুমোদনযোগ্য।’

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২৬ সেপ্টেম্বর একনেক সভার নোটিশ জারি করা হয়। সেখানে প্রকল্পগুলোর তালিকা রয়েছে। এগুলোর বাইরে রোববার পর্যন্ত আরেকটি প্রকল্প একনেকে সরাসরি উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

তালিকায় থাকা প্রকল্পগুলো হল : পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তুলাই এবং পুনর্ভবা নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (ব্যয় চার হাজার ৩৭১ কোটি টাকা), কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন (১ম পর্যায়- তৃতীয় সংশোধিত, ব্যয় দুই হাজার ১৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা) প্রকল্প, হাটহাজারী-ফটিকছড়ি-মানিকছড়ি-মাটিরাঙ্গা-খাগড়াছড়ি সড়ক উন্নয়ন (চট্টগ্রাম অংশ, ব্যয় ৩৯৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা), ভূরুঙ্গামারি-সোনাহাট স্থলবন্দর-ভিতরবন্দর নাগেশ্বরী মহাসড়কে দুধকুমার নদের ওপর সোনাহাট সেতু নির্মাণ (ব্যয় ২৩২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা), জার্মানির বার্লিনে বাংলাদেশ চ্যান্সারি কমপ্লেক্স নির্মাণ (ব্যয় ১০৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা), সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী ঘাটে গুঁড়ো দুগ্ধ কারখানা স্থাপন (ব্যয় ১০৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা), সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্প (ব্যয় ২৮০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা), মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে ভোলা জেলার সদর উপজেলার রাজাপুর ও পূর্ব ইলিশা ইউনিয়ন রক্ষার্থে তীর সংরক্ষণ প্রকল্প (প্রথম সংশোধিত, ব্যয় ৩৪৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা), চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী উপজেলায় হালদা নদী ও ধুরং খালের তীর সংরক্ষণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প (ব্যয় ১৫৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা), রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (আরওএসসি- দ্বিতীয় পর্যায়, ব্যয় ১ হাজার ৯৯০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা), বিএফডিসি কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প (ব্যয় ৩২২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা), জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট স্থাপন (ব্যয় ১৬৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা) এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন-গোপালগঞ্জ (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প (ব্যয় ২৫০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা)। এ ছাড়া সরাসরি উঠতে যাওয়া প্রকল্পটি হল সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষুদ্র সেচের উন্নয়ন। এটি বাস্তবায়নে ৮২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।