চট্টগ্রামে ইয়াবা ব্যবসায় পুলিশ

চট্টগ্রামে জব্দ ইয়াবা আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছেন একশ্রেণির পুলিশ সদস্য। মামলা ও চাকরি থেকে বরখাস্ত হলেও তাঁরা থামছেন না। গত বছরের আগস্ট থেকে এক বছরে এ ধরনের ঘটনায় পুলিশের সাত সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন। পলাতক রয়েছেন দুজন।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু সদস্যের এই অপকর্মে তাঁরা বিব্রত। পুলিশ সদস্যদের ইয়াবাপ্রীতি বন্ধ করতে উদ্বুদ্ধকরণের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও চলছে।

চলতি বছরের শুরুতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাদক চোরাকারবার ও সরবরাহে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তাকারীদের একটি তালিকা করে। এতে চট্টগ্রাম নগর ও জেলা পুলিশের ৩৫ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে শহরের পাঁচ থানার পাঁচ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নাম আছে। তাঁদের কারও বিরুদ্ধে অবশ্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

লোভে পড়ে পুলিশ সদস্যরা ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন বলে মনে করেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) আমেনা বেগম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ইয়াবা–সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কোনো পুলিশ সদস্যকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। মামলা ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোনো সদস্য যাতে এ পথে পা না বাড়ান, সে জন্য পুলিশের কল্যাণ সভাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁদের সতর্ক করা হয়। এ ছাড়া গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক পুলিশ সদস্য উদ্ধার হওয়া ইয়াবা কম দেখিয়ে আত্মসাৎ করেন। পরে এগুলো মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন। মাঠপর্যায়ের চার পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ১০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার হলে সোর্সকে দু–তিন হাজার দিয়ে দিতে হয়। না হলে সোর্স হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সোর্সদের কাছ থেকে অনেক মাদক ব্যবসায়ী এগুলো কিনে থাকেন।

পুলিশের ইয়াবা পাচার
গত ৩১ আগস্ট নগরের কোতোয়ালি থানার লালদীঘির পাড় পুরোনো গির্জা লেনের একটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে ৮০০ ইয়াবাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁরা হলেন জহিরুল ইসলাম, পলাশ ভট্টাচার্য ও আনোয়ার হোসেন। তাঁদের মধ্যে জহিরুল পুলিশ কনস্টেবল। তিনি চট্টগ্রাম আদালতের পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন (জিআরও) শাখায় কর্মরত ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তিনি কোতোয়ালি থানার পুলিশকে জানান, বিক্রির জন্য ইয়াবাগুলো তাঁর কাছে রেখেছেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আবদুল ওয়াদুদ। উদ্ধার করা ইয়াবা জব্দতালিকায় কম দেখিয়ে তিনি নিজের কাছে রাখেন। পরে বিক্রির জন্য দিয়েছেন। পলাশ ও আনোয়ার এগুলো কেনার জন্য এসেছিলেন। তার আগেই পুলিশ তাঁদের ধরে ফেলে।

এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. নুরুজ্জামান বাদী হয়ে ঘটনার রাতেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। মামলায় গ্রেপ্তার তিনজনকে আসামি করা হয়। ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন এএসআই ওয়াদুদ। এক মাস হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় মিনি ট্রাকে ফার্নিচারের আড়ালে ইয়াবা পাচারকালে মিরসরাইয়ের নিজামপুর এলাকায় ২৯ হাজার ২৮৫টি ইয়াবাসহ চালক ও সহকারীকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। তাঁরা জানান, ইয়াবাগুলো পুলিশের এসআই মো. বদরুদ্দোজার। এ ঘটনায় র‍্যাব বাদী হয়ে মিরসরাই থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করে। পরদিন পুলিশ এই মামলায় বদরুদ্দোজাকে গ্রেপ্তার করে। ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশ থেকে বদলি হয়ে দেড় মাস আগে তিনি চট্টগ্রাম নগর পুলিশে আসেন। এখন তিনি কারাগারে।

এর ১২ দিন আগে কক্সবাজার থেকে মোটরসাইকেলে ইয়াবা নিয়ে যাওয়ার সময় মিরসরাইয়ের বারইয়ার হাট থেকে ৩১ হাজার ৮০০ ইয়াবাসহ এএসআই আবুল বাশারকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত ছিলেন, এখন কারাগারে।

র‍্যাব গত ৩০ জুলাই নগরের পশ্চিম বাকলিয়া তুলাতলী এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে ১৪ হাজার ১০০ ইয়াবা উদ্ধার করে। গ্রেপ্তার করে বাড়ির মালিকের ছেলে মো. মিল্লাতকে। তিনি র‍্যাবকে জানান, বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন বাকলিয়া থানার এসআই খন্দকার সাইফ উদ্দিন। উদ্ধার করা ইয়াবা জব্দতালিকায় কম দেখিয়ে বাসায় রাখতেন। পরে এগুলো বিক্রি করতেন। ঘটনার পর সাইফকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও গ্রেপ্তার হননি। তদন্ত কর্মকর্তা রাজেস বড়ুয়া বলেন, গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

গত ১২ জুলাই নগরের চান্দগাঁও থানার বহদ্দারহাট বারইপাড়া এলাকা থেকে ইয়াবাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাঁদের মধ্যে একজন পুলিশের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এএসআই রিদওয়ান। ২০১৬ সালের ২৬ নভেম্বর নগরের নিউমার্কেট মোড় থেকে ইয়াবাসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। জামিনে এসে তিনি আবার ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। চান্দগাঁও থানায় কর্মরত ছিলেন রিদওয়ান।

নগরের আগ্রাবাদ এলাকা থেকে মো. নুরুচ্ছাফা ও মো. সাইফুলকে তিন হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁরা জানিয়েছেন, কামরুজ্জামান কামরুল নামের এক পুলিশের কাছ থেকে ইয়াবা কিনে তাঁরা বিক্রি করে থাকেন। ২ এপ্রিল কামরুলকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তিনি দামপাড়া পুলিশ লাইনসে কর্মরত ছিলেন।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ধরা পড়েন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা। তাঁর নাম আনোয়ার হোসেন। ২০১৭ সালের ২৮ নভেম্বর কর্ণফুলী থানার মইজ্জারটেক এলাকা থেকে তিন হাজার ইয়াবাসহ তিনি গ্রেপ্তার হন। ওই বছরের ২৬ আগস্ট নগরের ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ থেকে এসআই আফাজ উল্লাহ ও তাঁর দুই সহযোগী খোরশেদ আলম ও শহীদ উল্লাহকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। হালিশহর থানায় কর্মরত ছিলেন আফাজ।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, পুলিশে নিয়োগ ও বদলিতে টাকার বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। সোর্সকে ইয়াবা নয়, নগদ অর্থ দিতে হবে। পুলিশের ভেতর শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে মাদক–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরষের মধ্যে ভূত থাকলে কিছুই হবে না।