প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরিতে কোটা বাতিল

বেতন কাঠামোর নবম থেকে ১৩তম গ্রেড (সাবেক প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী) পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এখন থেকে এসব পদে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে। এ সংক্রান্ত সচিব কমিটিও এমন সুপারিশই করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বুধবার তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি সংস্কার/বাতিলে’ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়া হয়। খুব শিগগিরই এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হবে। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। তিনি বলেন, ‘আগের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর (বর্তমান ১৪তম থেকে ২০তম গ্রেড) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা এখনও বহাল আছে, সেটা থাকবে।’

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘কমিটির রিপোর্ট মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়। তিনটি সুপারিশ ছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ, কোটা বাতিল এবং কোটা বাতিলের ফলে বিদ্যমান জনগোষ্ঠীর বিষয়ে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ।’ মন্ত্রিসভা সচিব কমিটির তিনটি সুপারিশই অনুমোদন দিয়েছে বলে জানান শফিউল আলম। তিনি বলেন, কোটা বাতিলের ফলে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতে কি ধরনের সমস্যায় পড়েন তা পর্যালোচনা করে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। যদি কখনও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের জন্য কোটার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তবে সরকার তা করতে পারবে।

সরকারি চাকরিতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা বহাল আছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘আজ-কালের মধ্যে আমরা মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেব। এরপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করবে। আশা করছি দুই-তিন দিনের মধ্যে (প্রজ্ঞাপন) হয়ে যাবে।’ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে যেসব নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে- সেক্ষেত্রে কী হবে জানতে চাইলে শফিউল আলম বলেন, ‘সেগুলোতে কোনো সমস্যা নেই। যেগুলো অ্যাডভারটাইজ হয়ে গেছে, সেখানে কোটার ব্যাপারে বলে দেয়া আছে- সরকার কোটার ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেবে সেভাবেই কার্যকর হবে।’

ভবিষ্যতে অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য কোটা প্রয়োজন হলে, তা কারা পর্যালোচনা করবে- এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘এটা তো অনেকটা সেট কমিটি (মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে কোটা পর্যালোচনা কমিটি), পুনর্বিন্যাস করার প্রয়োজন হলে সরকার করতে পারে।’

যারা কোটা পেত, তাদের বিষয়টি অন্য কোনো আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু জিনিস অলরেডি আইনে আছে। প্রতিবন্ধীদের বিষয়টি সম্ভবত ওদের আইনে আছে। কিছু বিষয় বিধিমালায় আছে। ওগুলো আমাদের কোটার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।’

বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে নির্বাহী আদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি চালু করা হয়। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে নিয়োগে ৫৬ শতাংশ পদ বিভিন্ন কোটার জন্য সংরক্ষিত ছিল। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ, প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ।

এর বাইরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর চাকরিতে পোষ্য, আনসার-ভিডিপিসহ আরও কিছু কোটা রয়েছে। এই কোটার পরিমাণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিতে কয়েক মাস আগে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’। তাদের সেই আন্দোলন ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১১ এপ্রিল সংসদে বলেন, সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতিই আর রাখা হবে না। তবে পরে সংসদে তিনি বলেন, কোটা পদ্ধতি থাকবে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ রাখার বিষয়ে হাইকোর্টের রায় আছে।

এদিকে নতুন করে আন্দোলন দানা বাঁধার প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনা করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের নেতৃত্বে ২ জুন একটি কমিটি করে সরকার। শফিউল আলম ১৩ আগস্ট সাংবাদিকদের বলেন, তারা সরকারি চাকরির কোটা ‘যতটা সম্ভব’ তুলে দিয়ে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করবেন। আর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য কোটার বিষয়ে যেহেতু আদালতের রায় আছে, সেহেতু এ বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের মতামত নেয়া হবে।

সে অনুযায়ী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মতামত চাওয়া হলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তার মতামত সরকারকে জানান। সব কাজ শেষে সরকারি চাকরির নবম থেকে ত্রয়োদশ গ্রেড পর্যন্ত অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর পদে কোনো কোটা না রেখে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের নিয়ম চালু করতে ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ জমা দেয় সচিব কমিটি।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকার শাহবাগ থানায় চারটি ও রমনা থানায় একটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল একটি মামলায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের এক যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান এজাহারভুক্ত আসামি। বাকি চার মামলার কয়েকশ’ আসামির সবাই অজ্ঞাতনামা। মামলাগুলোর মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় দুটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আখতারুজ্জামানের বাসভবনে ভাংচুর, সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের গাড়ি ভাংচুর ও পুলিশের বিশেষ শাখার এক সদস্যের মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের চারটি ঘটনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সরকারি কমিটি কোটা নিয়ে দীর্ঘ পর্যালোচনা করে তাদের প্রতিবেদন তৈরি করে। ওই প্রতিবেদনে গত ১০টি বিসিএসের তথ্য তুলে ধরা হয়। তথ্য বিশ্লেষণে কমিটি দেখতে পায়, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ০৯ শতাংশ, নারী কোটায় সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তা কোটায় এক দশমিক ১৭ শতাংশ প্রার্থীকে চাকরি দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

আর বিদ্যমান ৩০ শতাংশ কোটা সংস্কার বা বাতিল করার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে মতামত চাওয়া হলে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা কমানো বা বাড়ানো রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ার। এ সংক্রান্ত মামলার লিভ টু আপিলের রায় কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) রিপোর্টের তথ্য তুলে ধরে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, পিএসসি তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোয় মেধার ভিত্তিতে কোটা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সুপারিশ করেছে।

বিভিন্ন কমিশন বা কমিটি কোটা সংস্কারে যেসব সুপারিশ করে, তাও তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে। বিদ্যমান কোটা অনুযায়ী পদ পূরণের বিষয়টি যে জটিল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার এবং শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার তথ্যও তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে।