মুক্তিযোদ্ধার নাতিই বলে কোটা চাই না, তাহলে দরকার আছে?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ তো চাকরি পাওয়ার মতো নেই, সবাই তো মারা যাচ্ছেন। যারা আন্দোলন করছেন তাদের সঙ্গে আমাদের সেক্রেটারি মিটিং করলেন। সেখানে অনেকেই বলল, আমরা মুক্তিযোদ্ধার নাতি কিন্তু আমরা কোটা চাই না। মেয়েরা বলল, আমরা কোটা চাই না, আমরা কমপিটিশন করেই আসব। মেয়েদের মনে যখন এ কনফিডেন্সটা দেখলাম তখন কোটা থাকার দরকারটা কী? মুক্তিযোদ্ধার নাতিই বলে কোটা চাই না, তাহলে দরকার আছে? আর এ কোটা থাকলে খালি আন্দোলন। তো কোটাই নেই, আন্দোলনও নেই, সংস্কারও নেই।

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের অভিজ্ঞতা জানাতে বুধবার গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই নিউইয়র্কে তার সফরের বিষয়ে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। লিখিত বক্তব্যের পর তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোটা যদি না থাকে সংস্কারের প্রশ্ন উঠবে না। আর যদি কেউ কোটা চায়, তাহলে কোটা চাই বলে আন্দোলন করতে হবে। আর সে আন্দোলন যদি ভালোভাবে করতে পারে, তখন ভেবেচিন্তে দেখব কী করা যায়। এরপর যদি কেউ কোনো কোটা চায় তাহলে আন্দোলন করতে হবে, বলতে হবে আমি এই কোটা চাই। সেটা আগে বলুক, আন্দোলন করুক। আন্দোলন ছাড়া দেব না।

তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর এই কোটা দেয়া হল। যারা মুক্তিযোদ্ধা, নির্যাতিত নারীদের জন্য বা যারা অনগ্রসর তাদের জন্য জাতির পিতা এটা করে গিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, আমরাও ছাত্র রাজনীতি করেছি, আন্দোলন করেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভিসির বাড়িতে ভাংচুর হল। রাত ১টা-দেড়টার সময় সুফিয়া কামাল হলের গেট ভেঙে ছাত্রীরা বের হয়ে চলে এলো, শামসুন্নাহার হল থেকে বের হয়ে এলো। একটা মেয়ের যদি ক্ষতি হতো এ দায়িত্ব কে নিত। সারারাত আমি জাগা ছিলাম।

বিরোধী জোটকে সাধুবাদ

আরেক প্রশ্নের জবাবের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ভোট দুই ধরনের। একটা ভোট আওয়ামী লীগের, আরেকটা এন্টি আওয়ামী লীগের। বিরোধী জোট বড় হচ্ছে, তারা সুষ্ঠু রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাক। আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। আমি তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেব কেন। তারা সুষ্ঠু রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাক, আমি তা চাই। বিরোধী রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এভাবে চলতে থাকুক।

মাদ্রাসা দিয়ে উপমহাদেশে শিক্ষার যাত্রা শুরু

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমাদের এই উপমহাদেশে শিক্ষার যাত্রা শুরু হয়েছিল মাদ্রাসা দিয়ে। হিন্দু ধর্মের জন্য (শিক্ষা শুরু) যেমন টোল (আদি শিক্ষা) থেকে; (তেমনই)আমাদের মুসলমানদের তেমন মাদ্রাসা শিক্ষা থেকে। তাই এটাকে আমরা সম্পূর্ণ বাতিল করতে পারি না। কারণ, ১৪ থেকে ১৫ লাখ ছেলেমেয়ে প্রতি বছর পড়াশোনা করে যাচ্ছে।

‘তারা কী পড়ছে, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে-তাদের কোনো ঠিকানা নাই। তাদেরকে একটা সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার বা সম্মান দেয়ার তাদের জীবন-জীবিকার পথটা সৃষ্টি করে দেয়া কি আমাদের কর্তব্য না?’-প্রশ্ন করেন প্রধানমন্ত্রী

কেউ ধর্মীয় অনুভূতির বাইরে না

শেখ হাসিনা বলেন, অনেকেই অনেক কিছু মনে করতে পারেন। কিন্তু আমি মনে করি, আমরা কেউ ধর্মীয় অনুভূতির বাইরে না। আমরা ধর্মকে অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু ধর্মকে অপব্যবহার হউক সেটাও আমরা চাই না। ধর্ম শিক্ষাটা আমাদের শিক্ষাটা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা তখনই যখন আমরা জীবন-জীবিকার শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাটা গ্রহণ করতে পারি সে শিক্ষাটাই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা হয়।

‘আপনার এক সময়ের শত্রু আল্লামা শফী এখন আপনাকে সংবর্ধনা দিচ্ছে-এ প্রসঙ্গে আপনার মতামত কী?’- একটি পত্রিকার সম্পাদকের করা এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আমার কোনো (হেফাজতের সঙ্গে) শত্রুতা ছিল না, এটা ভুল। কে শত্রু কে মিত্র তা দেখিনি।

এরকম পরিস্থিতি যেন বাংলাদেশে আর না ঘটে

৫ মের ঘটনা বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, আমি চেয়েছি যে, এরকম পরিস্থিতি যেন বাংলাদেশে আর না ঘটে। এবং বাংলাদেশের মানুষের নিরাপত্তা দরকার। তখনকার ওই অঞ্চলের সবাই ভয়ভীতির মধ্যে ছিল। এমন অবস্থা ছিল যে, তারা যেকোনো সময় যেকোনো ঘটনা ঘটাতে পারে। খালেদা জিয়া তো ওপেনলি তাদের সমর্থন দিয়ে দিল। জামায়াত তাদেরকে সমর্থন দিয়ে দিল।

প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘তাদের বলা হয়েছিল, ২০০ গরু জবাই করে খাওয়াবে। কিন্তু তাদেরকে খাওয়াই নাই, তারা মাদ্রাসার বাচ্চা বাচ্চা (ছেলেদের) নিয়ে আসছিল। তাদের ভাগ্যে একটা রুটি কলা ছাড়া কিছুই জুটেনি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেভাবেই হোক, আমি যেভাবেই পারি আমি তো টেনশন মুক্ত করেছি। কেউ তো আর সাধুবাদ দেবে না।

হেফাজতকে প্রধানমন্ত্রীর ধন্যবাদ

হেফাজতের দিকে ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, এক সময় তারা মনে করতো আমি ধর্মে বিশ্বাস করি না, এখন যদি তারা প্রশংসা করে তাহলে আমি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। সবার মনেই একটা স্বস্তি এসেছে যে, এখন আর (শাপলা চত্বরের মতো) ওই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না। আমি চেয়েছি এরকম পরিস্থিতি যেন আর না হয়, সেটা হয়ে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষার বিষয়ে বলব, এখানে লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়েরা পড়ে। আমাদের দেশে অনেক গরিব সন্তান, অনেক এতিম সন্তানরা সেখানে ঠাঁই পায়। কিন্তু তাদের আসলে কোনো স্বীকৃতিও ছিল না-তারা নিজেদের মতো নিজেরাই করতো।’

কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতিতে সারা দেশের মানুষ খুশি

তিনি বলেন,আমি চেষ্টা করে গেছি-এটার একটা সমাধান করতে। আজকে সেটা করে (কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি) দিয়েছি তাদের জন্য। কেউ যদি এখন আমার জন্য দোয়া করে বা কেউ যদি ভালো বলে তাহলে তো দেশের মানুষের খুশি হওয়া কথা। আর যারা আমার সত্যিকার ভালো চায় না, যারা আমাকে খুন করার চেষ্টা করছে, তারা হয়তো মনে কষ্ট পাবে, অখুশি হবে। কিন্তু সারা বাংলাদেশের মানুষ (কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতির কারণে) খুশি হয়েছে। এখন আমার অনুভূতি এতটুকুই যারা শিক্ষা গ্রহণ করতো তাদের যে একটা ভবিষ্যতের ঠিকানা করে দিতে পেরেছি সেটাই আমার বড় সেটিসফেকশন (তৃপ্তি)।