কালীগঞ্জের সেই কৃষাণী মর্জিনা বেগম এবার পেলেন সয়েল কেয়ার পদক

মোঃ হাবিব ওসমান, ঝিনাইদহ ব্যুরোঃ
নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জৈব যুদ্ধের যোদ্ধা যার কর্মকান্ড তুলে ধরে পত্র পত্রিকায় একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের আলোচিত সেই কৃষাণী মর্জিনা বেগম বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকের পর এবার পেলেন সয়েল কেয়ার পদক। গত বুধবার সকাল ১১ টায় বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসে কৃষি মন্ত্রনালয়ের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট কর্তৃক আয়োজিত ঢাকা খামারবাড়ি আ.কা.মু. গিয়াস উদ্দিন মিলকী অডিটরিয়ামে মর্জিনার হাতে এ পদক তুলে দেয়া হয়। মর্জিনা বেগম উপজেলার মহেশ্বরচাঁদা গ্রামের কৃষক নেতা মরহুম ওমর আলীর কন্যা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রনালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব নাসিরুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ির মহাপরিচালক কৃষিবিদ অমিতাভ দাস, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সুলতান আহমেদ, এফএও বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডি. সিম্পসন ও প্র্যাকটিক্যাল এগ্রিকালচার এর কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিম জাহান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনন্সটিউটের মহাপরিচালক বিধান কুমার ভান্ডার। এ অনুষ্ঠানে পরমানু কৃষি গবেষণা ইনন্সটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড.জহির উদ্দিনও বিশেষ সন্মাননা গ্রহন করেন।
প্রকাশ থাকে যে, মর্জিনা বেগমের বাবা প্রয়াত ওমর আলী ছিলেন একজন আদর্শ কৃষক। জীবনভর সংগ্রাম করেছেন কৃষকের ভাগ্য বদলের জন্য। তাই সারাদেশের মানুষ তাকে চিনতেন একজন কৃষক সংগঠক হিসেবে। উদ্দেশ্য ছিল ভাল তাই তার ডাকে সাড়া দিয়ে নিজ গ্রাম ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ উপজেলার মহেশ্বরচাদায় একাধিকবার এসেছেন দেশের খ্যাতিনামা কৃষিবিদেরা। তাদের দেয়া প্রযুক্তি কৃষিতে কাজে লাগিয়ে অল্পদিনের মধ্যে গ্রামটি হয়েছে কৃষিতে সমৃদ্ধশালী। পরিচিতি পেয়েছিল আদর্শ গ্রাম হিসেবেও। কিন্ত এই কৃষক নেতার অকাল মৃত্যুতে সব কিছু এলামেলো হতে থাকে। বাবার মৃত্যুর পর কৃষক শ্রেণীর মানুষের তার বাবার প্রতি ভালবাসা দেখে মর্জিনা বেগম শপথ নিয়েছিলেন তিনি নিজেও কৃষকের উন্নয়নে কাজ করবেন। মহেশ্বরচাদা গ্রামের একাধিক কৃষক জানান,মর্জিনার বাবা মরহুম ওমর আলীর কথায় সকল কৃষক ঐক্যবদ্ধভাবে সাড়া দিয়ে কৃষিতে ব্যপক উন্নতি লাভ করেছে। গত আ’লীগ সরকারের কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এসেছিলেন তাদের এ অজোপাড়াগায়ের গ্রামটিতে। তিনি এসে গ্রামটিতে বিজ্ঞান ভিত্তিক চাষাবাদে কৃষকদেরকে উদ্বুদ্ধ করেন। এ গুলো সবই হয়েছিল কৃষক দরদী মরহুম ওমর আলীর জন্য। কৃষকদের নিয়ে তার স্বপ্ন ছিল আকাশ সমান। কিন্ত তার অকাল মৃত্যুতে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলেও পরবর্তীতে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে মেয়ে মর্জিনা বেগম হাল ধরে কাজ করে চলেছেন। এই জৈব কৃষাণী কৃষিতে বিভিন্নভাবে অবদান রাখায় তাকে নিয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় একাধিক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে।
কৃষি এবং মাটির স্বাস্থ্য ভাল রাখা, বিষমুক্ত পরিবেশ বান্ধব ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) ও অর্গানিক পদ্ধতিতে জৈব বালাইনাশক উৎপাদন ব্যবহারে অভাবনীয় অবদান রাখায় সৃজনশীল কৃষাণী হিসেবে তিনি ২০১৪ সালে পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরষ্কার। ২০১৩ সালে সরকারী উদ্যোগে একজন কৃষাণী হিসেবে ভিয়েতনাম সফর করেছেন। ২০১৭ সালে তার নেতৃত্বে পরিচালিত মহিলা কার্ড সমিতির নেতৃ হিসেবে বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক গ্রহন করেন। ২০১৮ সালে নির্বাচিত হয়েছেন বিভাগীয় পর্যায়ের জয়িতা, ২০০৮ সালে নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করা জাপানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হাঙ্গার ফ্রি ওয়াল্ডের পক্ষ থেকে পেয়েছেন বিশেষ সন্মাননা।
কৃষাণী মর্জিনা বেগম সম্পর্কে জালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল করিম জানান, বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদনে সারাদেশের যে আন্দোলন শুরু হয়েছে আর যারা আগে থেকে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের যুদ্ধে নেমেছেন তাদের মধ্যে কালীগঞ্জের মর্জিনা বেগম অন্যতম। তিনি কৃষানীদের সংগঠিত করে অবিরাম কাজ করে চলেছেন। গ্রামের অসহায় নারীদেরকে প্রশিক্ষন দিয়ে বাড়ি বাড়িতে কেঁচো সার উৎপাদন করে বিক্রির মাধ্যমে আজ তারা স্বাবলম্বি হয়েছে। এক কথায় নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সমাজ উন্নয়নে যেভাবে মর্জিনা বেগম কালীগঞ্জের নারীদেরকে উৎসাহিত করছেন তার জুড়ি নেই। তিনি বলেন, তার কাজের জন্যই ইতোমধ্যে তিনি জাতীয় কৃষিসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পদক ও সন্মাননা পেয়ে কালীগঞ্জের সকলের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *